মস্তিষ্কের যন্ত্রণার অতীত, মানসিক দাসত্ব ও আমরা

মুক্তির কোলাহল বড় সুখের, ভ্যাপসা জীবনে হিমেল হাওয়া আসে কি না। কিন্তু সেই মুক্তি মেলে কীভাবে! জীবন যদি পায়ে একবার শিকল পরায় আর সেই বেড়িতে যদি একবার কেউ বাঁধা পড়ে । তবে বয়স যতই বাড়ুক না কেন , সেই কালশিটে মনে থেকে যায় আজীবন।

কথাটা একটু উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বললে, বোধ করি বুঝতে সুবিধা হবে। প্রথম ঘটনা- একজন মাহুত একটি হাতিকে পোষ মানানোর জন্য সে ছোটো থেকেই তার পায়ে শিকল বেঁধে দেয়। তখন হাতিটি ওই শিকল ছিঁড়ে বেরোতে চায়। শক্ত শিকলের দাপটে তার পা জখম হয়ে গিয়ে চলার উপায় থাকে না। এরকম চলতে চলতে হাতিটি বড় হয়। এরপর তার পায়ে যদি একটি সূক্ষ্ম নাইলনের সুতো বেঁধে দেওয়া হয়, হাতিটি তা ছিড়ে আর বেরোনোর সাহস করে না। কারণ একটাই। শৈশবের সেই অকথ্য যন্ত্রণা তার স্মৃতিতে তখনও তাজা।

ঘটনা দুই, বাজারে অনেকেই সাপের খেলা দেখিয়ে তাবিজ কবজ বিক্রি হতে দেখেছেন। আসলে এই সাপেদের পোষ মানানো হয়। জঙ্গল থেকে একটি বন্য তরতাজা প্রাণকে তুলে এনে তার তথাকথিত মালিক তাকে বশ মানায়। বশ মানাতে গিয়ে তার লেজে আঘাত করে, সে ফণা তুললে তার মুখে গুঁজে দেয় গনগনে লোহার শিক। এমন চলতে চলতে একদিন সাপটি বশ মেনে যায়। তখন তার সামনে নুড়ি পাথর আনলেও সে নুইয়ে পড়ে। অর্থাৎ এখানে সেই মানসিক দাসত্ব। বারে বারে আঘাত এনে এমন গভীরে তার মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়েছে যে, তার বিষ দাঁতও ভাঙতে হয়নি আর। মনিবের ছলা কলায় সে দাসত্ব স্বীকার করেছে ।

ফলত এ কথা স্পষ্ট যে একটা সময়ের পর শারীরিক যন্ত্রণা হয়তো আর থাকে না কিন্তু মানসিক আতঙ্ক এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, সর্বত্র সর্ব কাজে ভীতি জন্মায়। এ তো গেল তাদের কথা যাদের জীবন বোধ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর যে শিশুটির তথা মানুষটির জীবন বোধ রয়েছে তার আতঙ্ক কতটা কঠিন, সে যদি একবার জরাজীর্ণ মনের কাছে ক্রীতদাস হয়ে ওঠে তবে তা কতটা বিপজ্জনক তা একবার ভেবে দেখুন।

মানসিক দাসত্ব কী , একথা খুব সহজে বলতে গেলে বলা যায় মনের কাছে যে দাসত্ব স্বীকার করেছে। কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন এই মন কার ,এই মনের গঠন কীভাবে হয়। এই মনের গঠন তো আমাদের চারপাশে যা হয়ে চলেছে, আমাদের সাথে প্রতিনিয়ত যা ঘটে চলেছে, আমরা যে ঘটনার অংশ তারই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবিম্ব। ফলত তুমি পারবে, তুমি পারবে- এ কথা যেমন ভেঙে যাওয়ার শিরদাঁড়া নিয়ে নুইয়ে থাকা একটি মানুষকে দৃঢ় করে তুলতে পারে। ঠিক তেমনি তুমি পারবে না- কথাটি অসম্ভব প্রতিভাধর কোন স্বত্তা কেও জীবন যুদ্ধে হারিয়ে ফেলতে সক্ষম।

এই হল মানসিক দাসত্ব। যেখানে প্রভু আর অন্য কেউ নন স্বয়ং মন। তারই অঙ্গুলি হেলনে চলে সব। তাই বর্তমানে যা করছি যা করব ভবিষ্যতে সেই সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে সেই সতর্কতা যেন আবার এমন না হয় যে মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে,বাঁচতে ভুলে যাই আমরা। যা হয়েছে তা হয়েছে, সত্যরে লও সহজে। তার কালশিটে শরীরে জমতে না দিয়ে আপন গুনে তো মুছে ফেল। নয়তো গেল গেল রব সারাজীবন দগ্ধ ঘা এর মত যন্ত্রণা দেবে, পোষ মানবে সকলে তার। ‘আমি’ নিয়ে এত ভাবনা কিসের যখন তিনি আছেন সঙ্গে । যা গেছে তা যাক যাক, যা গেছে তা যাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.