সৃষ্টির কোনও প্রান্তে কি মিলে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ!

রবীন্দ্রনাথের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উক্তি রয়েছে-যেখানে কথার শেষ হয় গানের শুরু সেখান থেকেই হয়। অর্থাৎ কথা বলে যে গুরুগম্ভীর ভাবাবেগ সহজে বোঝানো যায় না বা অনুভূতি সৃষ্টি করা যায় না ,সেই কাজ নিমিষেই একটি গানের মাধ্যমে করা যেতে পারে। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, চলচ্চিত্রের গল্পের সাথে সংগীতের সামঞ্জস্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে। আর সেখানেই সত্যজিতের ছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীতের সাথে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকোণের মেলবন্ধন আছে কি না, তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে | যেমন ধরুন –
বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে
আমার নিভৃত নব জীবন-‘পরে
প্রভাতকমলসম ফুটিল হৃদয় মম
কার দুটি নিরুপম চরণ-তরে॥

রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সত্যজিত রায় তাঁর আগন্তুক ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন| রবীন্দ্রনাথ যে দৃষ্টিকোণ থেকে গানটি লিখেছেন সেই ভাবনার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় যে গানটি কিশোরী বয়সে বেনি দুলিয়ে মনের প্রেমিক স্বত্বাকে উদযাপনের গান। এটি প্রেম পর্যায়ের একটি গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও চারুবালার বিবাহ উপলক্ষে এই গান রচনা করেছিলেন।

সম্ভবত ঠাকুর গানটিকে চারুবালার দৃষ্টিকোণ থেকে রচনা করেছেন। সেই সময় মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হওয়ার প্রথা ছিল। যখন বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে আমার নিভৃত নবজীবনও পরে অর্থাৎ ছোট্ট মেয়েটি যখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তখন তার নিভৃত নিস্তরঙ্গ জীবনে নতুন ছন্দ এলো, নতুন করে সে জীবনটিকে দেখতে শুরু করল। এরপর কোথা হতে সমীরণ আনে নব জাগরণ পরানের আবরণ মোচন করে| এর মাঝে কোথা থেকে নতুন হাওয়া তথা নতুন চিন্তন আসে, মনে নতুন চিন্তার ভাবমূর্তির উদ্রেক হয়। লাগে বুকে সুখে দুখে কত যে ব্যথা কেমনে বুঝায় কব না জানি কথা- নতুন জীবন সুখকর হওয়ার আশা কিশোরীর মনে থাকলেও সে পুলকিত হলেও তার মনে ভয় সংশয় আছে। ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত যেমন আছে তারও তেমন ভালো লাগা মন্দলাগা সুখ অসুখ আছে। নতুন সংসারে অপরিচিত লোকের মাঝে সে কাকে এ কথা বুঝিয়ে বলবে, কে বুঝবে তার ব্যথা।

আমার বাসনা আজি  ত্রিভুবনে উঠে বাজি, কাঁপে নদী বনরাজি বেদনাভরে , মেয়েটির ভাবনা কেউ বুঝতে না পারলেও প্রকৃতি যেন তা বুঝতে পারে সে যে ভালো নেই ।সে দুঃখে নদীর জল পর্যন্ত কাঁপে অর্থাৎ বৃষ্টির জল তরঙ্গ তলে পরিবেশ পরিস্থিতি তার শোকে অনুতপ্ত হয়।

এইতো গেলে রবীন্দ্রনাথের সম্ভাব্য দৃষ্টিকোণ| তবে স্বাভাবিক অর্থে ধরতে গেলে সিনেমায় গানের দৃশ্যপটের সাথে মূল গানের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যার কোন মিল নেই। আর এখানেই সত্যজিতের কারিগরি| একেবারে অন্য পর্যায়ের একটি গানকে ৩৬০ ডিগ্রী উল্টো একটি দৃশ্যে তিনি এমন মুন্সিয়ানার সাথে তুলে ধরেছেন যে কোথাও এতটুকু অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়নি গানটি।

এই গানটিকে সিনেমাটিতে চায়ের আসরের গুরুতর আলোচনা পর্বে রাখার পিছনে সত্যজিৎ রায়ের সম্ভাব্য কারণগুলি হতে পারে-
প্রথমত গানটি বেহাগ রাগে আধারিত | এখানে মা স্বরটি একপ্রকার অগন্তুকের মতই যা তীব্র মধ্যম বিবাদী স্বর হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবুও মা খুব সুন্দর ভাবে খাপ খেয়ে গেছে। ঠিক একইভাবে ভাগ্নির শ্বশুরবাড়িতে মামার আগমন আগন্তুক এর মতই| তবুও ধীরে ধীরে সে পরিবারের সদস্যদের সাথে মিশে যাচ্ছিলেন। কোথাও গিয়ে গানটির স্বরের ব্যবহার ও চলচ্চিত্রটির অর্থ অভিন্ন| তাই ব্যবহার একপ্রকার যুক্তিযুক্ত হয়েছে |

দ্বিতীয়ত গানটির ইতিহাস চর্চা করলে বোঝা যায় গানটি কোন এক কিশোরী বধুর বিবাহ উপলক্ষে লেখা। সেকালের প্রথা অনুযায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে বিশেষত স্ত্রী স্বামী সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতেন না। একপ্রকার নিজ পরিবারের উপর আস্থা রেখে তিনি বিয়েতে বসতেন। স্বামী তার বৈবাহিক জীবনের প্রথম দিকে অনেকটা আগুন্তুকের মতোই। একইভাবে সিনেমায় ভাগ্নির নিস্তরঙ্গ জীবনে মামাও আগন্তুকের মতোই এসেছে।

অর্থসহ ব্যাখ্যা করতে গেলে বোঝায়-বাজিল কাহার বীণা, মধুর স্বরে আমার নিভৃত নবজীবন পরে প্রভাত কমল সম ফুটিলো হৃদয়ে মম কার দুটি নিরুপম চরণ তরে-
বিবাহিত খুকি তথা ভাগ্নির জীবন স্বামী পুত্র নিয়ে একভাবে কেটে যাচ্ছিল কিন্তু তার জীবনে মধুর স্বর তথা মামার আগমন নবজীবন দান করল কারণ ৩৫ বছর পর নিখোঁজ মামা তার কাছে ফিরেছে। যতই সে মামা কি না! সেই বিষয়ে কিঞ্চিত দ্বন্দ্ব থাক। সে তো মনে মনে তাকে মামা হিসেবেই মেনে নিয়েছে। তার বাড়িতে তার মামার পায়ের ধুলো পড়া তথা কার দুটি নিরুপম চরণ যেন তার মনে এক অতুলনীয় নির্মল আনন্দের উদ্রেক করেছে। লাগে বুকে সুখে দুখে কত ব্যথা কেমনে বুঝায় কব না জানি কথা আমার বাসনা আজি ত্রিভুবনে উঠে বাজি কাঁপে যদি বনরাজি বেদনা ভরে।

কিন্তু মামার আগমন যে শুধু সুখকর, তাকে আপ্যায়ন করেই যে ক্ষান্ত হওয়া যাচ্ছে তা নয়। প্রতি মুহূর্তে মনের মধ্যে বিবাদ চলছে সে আসল নাকি নকল, সৎ না অসৎ। তিনি যদি আসল হন, তবে তার উপর এরূপ সন্দেহ ভীষণ অন্যায় ও লজ্জাজনক। এই সব ভেবে যার লিপে গানটি অর্থাৎ ভাগ্নি খুবই চিন্তিত এবং বিবেক দংশনে ভুগছেন। এই সুখ দুঃখ তিনি কারো সাথে ভাগ করতে পারছেন না। তার সমস্তটা যেন উথাল পাথাল হয়ে যাচ্ছে। ফলত, তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায় যে সত্যজিতের ছবির দৃশ্যে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীতের সাথে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিকোণের অতি গভীরে মেলবন্ধন থেকেই যায় কি বলেন !

Leave a Reply

Your email address will not be published.