করিব করিব সিঙ্গল থেকে গেলাম…

সিনেমা যে একটা আর্টফর্ম, তখনও বুঝিনি। তখন সিনেমা বলতে দেবের আই লাভ ইউ, রুমাল বেঁধে বুম্বাদার মারপিট কিংবা শাহরুখ-সলমন গোছের কিছু একটা দেখতাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমা পড়তে শুরু করি। এতদিন যা কিছু বোকা বোকা স্লো-বোরিং সিনেমা মনে হত, এবার সেই সমস্ত সিনেমাতেই যেন থামতে ইচ্ছে করছিল। সংলাপ, চরিত্র, গল্পের মাঝে কী একটা যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম। যা অজান্তেই স্নিগ্ধতা দেয়। আর সেই পথে চলতে গিয়েই লাইফ ইন আ মেট্রোতে আপনার সঙ্গে আলাপ।

সেদিন বুঝেছিলাম তিন খানের বলিউডের বাইরে একজন চতুর্থ খান রয়েছে। ইরফান খান। তখন কলেজ জীবনের মধ্য গগনে। প্রেমে পড়ছি, মেস জীবনের টানাপোড়েন নিত্যদিনের সঙ্গী। গ্রাম-মফস্বল ছেড়ে কলকাতার অলি-গলি চিনছি। একদিন হঠাৎ করে শেক্সপিয়র পড়তে শুরু করি। শুধুমাত্র মানুষের টুকরো টুকরো আবেগ লিখে ৪৫০ বছরের পরও একজন কীভাবে এতটা প্রাসঙ্গিক, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমন সময় মকবুলে আপনার সঙ্গে ফের দেখা। সেদিন হিরো আর অভিনেতার পার্থক্যটা করতে পেরেছিলাম।

একটা সময় ভারতীয় সিনেমা পড়তে শুরু করি। মীরা নায়ার পড়ি। তারপর সালাম বম্বে দেখি, নেমসেক দেখি। আপনার চলে যাওয়ার কয়েক বছর অতিক্রান্ত। ভাবতে অবাক লাগছে নেমসেকের সেই অশোক গাঙ্গুলির সঙ্গে আর দেখা হবে না। কত সিনেমা বলব। পিকু, হিন্দি মিডিয়াম, লাঞ্চবক্স, তলওয়ার, পান সিং তোমর, লাইফ অফ পাই, বিল্লু, রোগ… না, আর মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে । অবশ্য না পড়লেই ভালো। কষ্ট বাড়ছে।

তখন শাহরুখের কান্না দেখে মাঝে মাঝে উফফ… বলে উঠতাম। বিল্লু দেখার পর আর কোনওদিন করিনি। শুধু একটা চোখ, একটা চাওনি এত দুঃখ কী করে বলতে পারে ? আজও বুঝিনি। দেখে মনে হত পাশের বাড়ির লোকটা সেলুলয়েডে অবলীলায় তার গল্প বলে যাচ্ছে । আর দুটো চোখ কী অদ্ভুত একাকীত্ব, উদাসীনতা নিয়ে কখনও প্রেম নিবেদন করছে, কখনও মানুষকে বাস্তবের সামনে দাঁড় করাচ্ছে আর কখনও অনেক কিছু না পাওয়ার কথা খুব সহজে বলে দিচ্ছে। এখনও ভুলতে পারিনি জজ়বার সেই ডায়লগ – মহব্বত হ্যায় ইসিলিয়ে জানে দিয়া, জিদ হোতি তো বাহো মে হোতি। এভাবে যে কত সংলাপের প্রেমে পড়েছি । না, বোধহয় আপনার বলা সংলাপের প্রেমে পড়েছি।

২০২০ অনেক কিছু নিয়েছিল আর আচমকা একদিন আপনাকেও কেড়ে নেয়। জানি না আর রাজস্থানের খাজুরিয়ায় সেই ক্রিকেটার ইরফান আলি খান ফিরবে কি না। জানি না ভারতীয় সিনেমা আর কোনওদিন ইরফানের ছোঁয়া পাবে কি না । তবে আপনি খানিকটা ওই প্রিয় ছোটো গল্পটার মতো । শেষ হয়েও হলেন না। এই ম্যান অফ ফিউ ওয়ার্ডসকে খুব মনে পড়বে। বারবার মনে পড়বে। আপনাকে হারিয়ে আপনার স্টাইলে “করিব করিব সিংগল” থেকে গেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.